❏ জানাযার পরে দোয়া
জানাযার নামাজের পর কাতার ভঙ্গ করে একাকী কিংবা সম্মিলিতভাবে মৃত ব্যক্তির জন্যে দোয়া-ইস্তেগফার করা মুস্তাহাব-সুন্নাত। ইহার দ্বারা মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয় এবং দোয়াকারী সওয়াবের অধিকারী হন। এই দোয়া স্বয়ং রাসূলে পাক (ﷺ) ও সাহাবী-তাবেয়ীগণের যুগ থেকে চলে আসছে, আজও পর্যন্ত সুন্নী উলামায়ে কেরাম এবং নবী প্রেমিকদের মাধ্যমে এই আমল বিদ্যমান রয়েছে। বর্তমান যুগের কিছু সংখ্যক ওহাবী ও খারেজী ব্যতীত এই আমলে বিরোধিতা কেহ’ই করেননি। অথচ জানাযার পরে দোয়া রাসূলে পাক (ﷺ) ও সাহাবীগণ থেকে প্রমাণিত রয়েছে। নিচে এ ব্যাপারে দলিল-আদিল্লাহ উল্লেখ করা হলো:-
❏ প্রিয় নবীজি (ﷺ) এঁর জানাযার পর দোয়া
আমাদের প্রিয় নবী রাসূলে আকরাম (ﷺ)’র জানাযার সালাত কারো ইমামতির মাধ্যমে সংঘঠিত হয়নি। কারণ রাসূল পাক (ﷺ)’র ইমাম হওয়ার যোগ্য কারো নেই বরং তিনিই সকল নবী ও রাসূলগণের ইমাম। এক্ষেত্রে প্রিয় নবীজি (ﷺ) কাউকে অনুমতিও প্রদান করে যাননি। এ কারণে সাহাবীগণ যার যার ব্যক্তিগতভাবে প্রিয় নবীজির উপর সালাত-সালাম পাঠ ও দোয়া করেছেন। এ বিষয়ে নিচের রেওয়ায়েত গুলো লক্ষ্য করুন।
ইমাম আব্দ ইবনু হুমাইদ (رحمة الله عليه) বর্ণনা করেছেন,
حَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ الْفَضْلِ، ثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ دَاوُدَ، قَالَ: ذَكَرَ سَلَمَةُ بْنُ نُبَيْطٍ، عَنْ نُعَيْمِ بْنِ أَبِي هِنْدَ، عَنْ نُبَيْطِ بْنِ شَرِيطٍ، عَنْ سَالِمِ بْنِ عُبَيْدٍ، قَالَ: مَرِضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ৃفَقَالُوا: يَا صَاحِبَ رَسُولِ اللَّهِ أَنُصَلِّي عَلَيْهِ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالُوا: كَيْفَ نُصَلِّي عَلَيْهِ؟ قَالَ: يَدْخُلُ قَوْمٌ فَيُكَبِّرُونَ وَيُصَلُّونَ وَيَدْعُونَ، ثُمَّ يَخْرُجُونَ، ثُمَّ يَدْخُلُ غَيْرُهُمْ حَتَّى يَفْرُغُوا،
-“ছালিম ইবনু উবাইদ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে আকরাম (ﷺ) অসুস্থ হলেন।... লোকেরা এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূলের সাহাবী (আবু বকর) আমরা কি রাসূল (ﷺ)’র উপর সালাত পড়বনা? তিনি বললেন, হ্যাঁ। লোকেরা বলল, আমরা কিভাবে রাসূল (ﷺ)’র উপর সালাত পড়ব? তিনি বললেন, তোমরা একদল হুজরা মুবারকে প্রবেশ করো এবং তাকবীর পাঠ করো অত:পর সালাত আদায় করো অত:পর দোয়া করো তারপরে সেখান থেকে বের হয়ে আসবে। তারপরে অন্যরা প্রবেশ করবে এবং বের হয়ে আসবে।”(মুসনাদু আব্দ ইবনে হুমাইদ, হাদিস নং ৩৬৫;)
এ বিষয়ে আরেকটি রেওয়ায়েত লক্ষ্য করুন, ইমাম মুহাম্মদ ইবনু সা’দ (رحمة الله عليه) বর্ণনা করেছেন,
أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُمَرَ حَدَّثَنِي مُوسَى بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ إِبْرَاهِيمَ بْنِ الْحَارِثِ التَّيْمِيُّ قَالَ: وَجَدْتُ هَذَا فِي صَحِيفَةٍ بِخَطِّ أَبِي فِيهَا: لَمَّا كُفِّنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَوُضِعَ عَلَى سَرِيرِهِ دَخَلَ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ فَقَالا: السَّلامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ! وَمَعَهُمَا نَفَرٌ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالأَنْصَارِ قَدْرَ مَا يَسَعُ الْبَيْتُ. فَسَلَّمُوا كَمَا سَلَّمَ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ وَصَفُّوا صُفُوفًا لا يَؤُمُّهُمْ عَلَيْهِ أَحَدٌ. فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ. وَهُمَا فِي الصَّفِّ الأَوَّلِ حِيَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: اللَّهُمَّ إِنَّا نَشْهَدُ أَنْ قَدْ بَلَّغَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ وَنَصَحَ لأُمَّتِهِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى أَعَزَّ اللَّهُ دِينَهُ وَتَمَّتْ كَلِمَاتُهُ فَآمَنَ بِهِ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ. فَاجْعَلْنَا يَا إِلَهَنَا مِمَّنْ يَتَّبِعُ الْقَوْلَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ وَاجْمَعْ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُ حَتَّى يَعْرِفَنَا وَنَعْرِفَهُ فَإِنَّهُ كَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفًا رَحِيمًا. لا نَبْتَغِي بِالإِيمَانِ بَدَلا وَلا نَشْتَرِي بِهِ ثَمَنًا أَبَدًا. فَيَقُولُ النَّاسُ: آمِينَ آمِينَ! ثُمَّ يَخْرُجُونَ وَيَدْخُلُ آخَرُونَ حَتَّى صَلَّوْا عَلَيْهِ.
-“মূসা ইবনু মুহাম্মদ ইবনে ইব্রাহিম তাইমী (رحمة الله عليه) বলেন, আমি আমার পিতার একটি পান্ডুলিপিতে পেয়েছি, যখন রাসূলে পাক (ﷺ)’কে কাফন পড়ানো হল তখন খাটিয়ার উপর রাখা হল। হযরত আবু বকর ও উমর (رضي الله عنه) প্রবেশ করলেন এবং বললেন: আস সালামু আলাইকা আইয়ূহান্নাবী ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ। তাঁদের সাথে আনসার ও মুহাজিরগণের ছোট একটি দল ছিল, যতটুকু ঘরে সংকুলান হয়েছে। তারাও সালাম দিয়েছেন যেমনিভাবে হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (رضي الله عنه) সালাম দিয়েছেন। তারা সকলেই কাতারবন্দী হয়েছিল কিন্তু কেউ ইমামতি করেননি। হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (رضي الله عنه) রাসূল (ﷺ)’র সামনে প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে বললেন,
اللَّهُمَّ إِنَّا نَشْهَدُ أَنْ قَدْ بَلَّغَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ وَنَصَحَ لأُمَّتِهِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى أَعَزَّ اللَّهُ دِينَهُ وَتَمَّتْ كَلِمَاتُهُ فَآمَنَ بِهِ وَحْدَهُ لا شَرِيكَ لَهُ.ৃ
-লোকেরা বলতে লাগলেন, ‘আমিন-আমিন’। অত:পর তারা বের হয়ে আসল ও অন্যান্যরা প্রবেশ করলো এবং প্রিয় নবীজি (ﷺ)’র উপর সালাত আদায় করলেন।”(ইমাম ইবনু সা’দ: তাবকাতুল কুবরা, ২য় খন্ড, ২২১ পৃঃ;)
এই হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, প্রিয় নবীজি (ﷺ)’র ইমাম ব্যতীরেকে জানাযার সালাতের পরে হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (رضي الله عنه) দুইজন দোয়া করেছেন এবং বাকী সাহাবীগণ ‘আমিন- আমিন’ বলেছেন। অর্থাৎ, সম্মিলিতভাবে দোয়া করেছেন।
এ বিষয়ে আরেকটি রেওয়ায়েত লক্ষ্য করুন, ইমাম বুখারী (رحمة الله عليه)’র শায়েখ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনু সা’দ (رحمة الله عليه) বর্ণনা করেছেন,
أَخْبَرَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُمَرَ. حَدَّثَنِي عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ عُمَرَ بْنِ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ عَنْ عَلِيٍّ قَالَ: لَمَّا وُضِعَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى السَّرِيرِ قَالَ عَلِيُّ: أَلا يَقُومُ عَلَيْهِ أَحَدٌ لَعَلَّهُ يَؤُمَّ؟ هُوَ إِمَامِكُمْ حَيًّا وَمَيِّتًا! فَكَانَ يَدْخُلُ النَّاسُ رَسَلا رَسَلا فَيُصَلُّونَ عَلَيْهِ صَفًّا صَفًّا لَيْسَ لَهُمْ إِمَامٌ وَيُكَبِّرُونَ وَعَلِيٌّ قَائِمٌ بِحِيَالِ رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: سَلامٌ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ! اللَّهُمَّ إِنَّا نَشْهَدُ أَنْ قَدْ بَلَّغَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ وَنَصَحَ لأُمَّتِهِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى أَعَزَّ اللَّهُ دِينَهُ وَتَمَّتْ كَلِمَتُهُ! اللَّهُمَّ فَاجْعَلْنَا مِمَّنْ يَتَّبِعُ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ إِلَيْهِ وَثَبِّتْنَا بَعْدَهُ وَاجْمَعْ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُ! فَيَقُولُ النَّاسُ: آمِينَ آمِينَ! حَتَّى صَلَّى عَلَيْهِ الرِّجَالُ ثُمَّ النِّسَاءُ ثُمَّ الصِّبْيَانُ
-“হযরত আলী (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, যখন রাসূলে পাক (ﷺ) কে খাটিয়ার মধ্যে রাখা হল, তখন হযরত আলী বলল: তোমাদের এমন কেউ আছে কি যে ব্যক্তি রাসূল (ﷺ)’র ইমামতি করবে? অথচ তিনি তোমাদের জিবীত ও মৃত অবস্থায় ইমাম! ফলে লোকেরা দলে দলে হুজরা মুবারকে প্রবেশ করলেন ও সালাত আদায় করলেন কিন্তু তাদের কোন ইমাম ছিলনা এবং তারা তাকবীর পাঠ করলেন। হযরত আলী (رضي الله عنه) রাসূলে পাক (ﷺ)’র সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এবং সালামুন আলাইকা আইয়ূহান্নাবী ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ! এরপরে বললেন,
اللَّهُمَّ إِنَّا نَشْهَدُ أَنْ قَدْ بَلَّغَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ وَنَصَحَ لأُمَّتِهِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ حَتَّى أَعَزَّ اللَّهُ دِينَهُ وَتَمَّتْ كَلِمَتُهُ! اللَّهُمَّ فَاجْعَلْنَا مِمَّنْ يَتَّبِعُ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ إِلَيْهِ وَثَبِّتْنَا بَعْدَهُ وَاجْمَعْ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُ!
-লোকেরা বলতে লাগল, ‘আমিন- আমিন’। ফলে সকল পুরুষ লোকেরা সালাত আদায় করল অত:পর মহিলারা অত:পর শিশুরাও।”(ইমাম ইবনু সা’দ: তাবকাতুল কুবরা, ২য় খন্ড, ২২২ পৃঃ;)
উপরোক্ত হাদিস গুলো থেকে স্পষ্ট প্রতিয়মান হয়, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) এর পবিত্র জানাযার সালাত ইমাম ব্যতীরেকে সাহাবীগণ আদায় করেছেন এবং সেখানে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (رضي الله عنه), হযরত উমর (رضي الله عنه) ও হযরত আলী (رضي الله عنه)সহ অন্যান্য সাহাবীগণ সালাম পাঠের পরে দোয়া করেছেন সাথে অন্যান্য সাহাবীগণ ‘আমিন- আমিন’ বলেছেন। যা জানাযার পরে সম্মিলিতভাবে দোয়া করা প্রকাশ দলিল। এ ছাড়াও সম্মিলিতভাবে দোয়া করার আরো ফজিলত রয়েছে। এই বিষয়ে অত্র কিতাবে পূর্বে দলিল ভিত্তিক আলোচনা করা হয়েছে।