❏ একটি খোড়া-যুক্তি ও তার জবাব


অনেকে প্রশ্ন করেন, সালাত মানেই দোয়া, তাহলে দোয়ার পরে আবার দোয়ার কিসের প্রয়োজন?

তাদের জবাবে বলব, সালাত মানেই শুধু দোয়া নয়, সালাতের মোট পাঁচটি অর্থ রয়েছে। পবিত্র কুরআনে সালাতকে জিকির বলা হয়েছে। নামাজে সূরা ও ক্বিরাত রয়েছে, এগুলো কি দোয়া? নামাজে তাকবীর, রুকু-সিজদা রয়েছে, এগুলো কি দোয়া? নামাজে তাশাহুদ, দুরুদ শরীফ ও তাসবীহ রয়েছে, এগুলো কি দোয়া? 

নদীর মধ্যে পানি রয়েছে, তাই বলে নদীর নাম পানি নয়, বরং নদীর নাম নদী’ই। যদি বলা হয়, নামাজের ভিতরে যেহেতু দোয়া রয়েছে সেহেতু পরে আবার দোয়ার দরকার কি? জবাবে বলব, ভাত ও তরকারী-ডালে পানি রয়েছে, তারপরেও আমরা আবার পানি পান করি, কেন? দোয়ার পরে দোয়া করার যাবেনা এই ধরণের আজব দলিল ইসলামী শরিয়তে নেই। বরং বান্দাহ যত বেশী দোয়া করবে মহান আল্লাহ পাক তত বেশী খুশি।

❏ নামাজের পর দোয়া করার কারণ


প্রথমত ফরজ নামাজের পরে দোয়া করলে ঐ দোয়া কবুল হওয়ার ১শত ভাগ নিশ্চয়তা রয়েছে। দ্বিতীয়ত সম্মিলিতভাবে দোয়া করলে ঐ দোয়া কবুল হওয়ার ১শত ভাগ নিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়াও আরো অনেক কারণ বিদ্যমান রয়েছে। নিচের হাদিস গুলোর প্রতি লক্ষ্য করুন, 


আল্লাহর নবী (ﷺ) এরশাদ করেন, ইমাম বুখারী, ইমাম বাজ্জার, ইমাম ইবনু হিব্বান, ইমাম হাকেম, ইমাম আহমদ, ইমাম তাবারানী (رحمة الله عليه) প্রমূখ বর্ণনা করেছেন,

 حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ دَاوُدَ، حَدَّثَنَا عِمْرَانُ، عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي الْحَسَنِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضى الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: لَيْسَ شَيْءٌ أَكْرَمَ عَلَى اللَّهِ مِنَ الدُّعَاءِ

-“হযরত আবু হুরায়রা (رضي الله عنه) বলেন, রাসূলে পাক (ﷺ) বলেছেন: আল্লাহর কাছে দোয়ার চেয়ে অধিক সম্মানী কিছুই নেই।” 

(ইমাম বুখারী: আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ৭১২; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ৮৭৪৮; মেসকাত শরীফ, ১৯৫ পৃঃ; মুসনাদে বাজ্জার, হাদিস নং ৯৫৫৫; সহীহ্ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৮৭০; ইমাম তাবারানী: মু’জামুল আওছাত, হাদিস নং ৩৭০৬; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস নং ১৮০১; ইমাম বায়হাক্বী: দাওয়াতুল কবীর, হাদিস নং ৩; ইমাম বায়হাক্বী: শুয়াবুল ঈমান, হাদিস নং ১০৭১; ইমাম মোল্লা আলী: মেরকাত শরহে মেসকাত, ৫ম খন্ড, ১২০ পৃঃ; সুনানে ইবনে মাজাহ, ২৭৫ পৃঃ;) 


এই হাদিস সম্পর্কে ইমাম হাকেম (رحمة الله عليه) বলেন, هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ 

-“এই হাদিসের সনদ সহীহ্।” 

নাছিরুদ্দিন আলবানী তার ‘সহীহ্ আদাবুল মুফরাদ’ কিতাবের ৫৫২ নং হাদিসের তাহকিকে حسن হাছান বলেছেন। এই হাদিস দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানী বিষয় হল আল্লাহর কাছে দোয়া করা। তাই আমাদের বেশী বেশী দোয়া করা উচিৎ। এছাড়াও আরো অনেক কারণ রয়েছে। 


অন্যত্র প্রিয় নবীজি (ﷺ) বলেছেন:

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ حُجْرٍ، قَالَ: أَخْبَرَنَا الوَلِيدُ بْنُ مُسْلِمٍ، عَنِ ابْنِ لَهِيعَةَ، عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ أَبِي جَعْفَرٍ، عَنْ أَبَانَ بْنِ صَالِحٍ، عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الدُّعَاءُ مُخُّ العِبَادَةِ.

-“হযরত আনাস ইবনে মালেক (رضي الله عنه) বলেন, রাসূলে পাক (ﷺ) বলেছেন: সকল এবাদতের মগজ হল দোয়া।” 

(মেসকাত শরীফ, ১৯৫ পৃঃ হাদিস নং ২২৩১; তিরমিজি শরীফ, হাদিস নং ৩৩৭১; ইমাম তাবারানী: আদ-দোয়া, হাদিস নং ৮; ইমাম তাবারানী: মু’জামুল আওছাত, হাদিস নং ৩১৯৬; জামেউল উছুল, হাদিস নং ৭২৩৭; ইমাম মোল্লা আলী: মেরকাত শরহে মেসকাত, ৫ম খন্ড, ১২০ পৃঃ; তুহফাতুল আশরাফ, হাদিস নং ১৬৫; ইমাম সুয়ূতী: ফাতহুল কবীর, হাদিস নং ৬৩৮৬; ইমাম হিন্দী: কানজুল উম্মাল, হাদিস নং ৩১১৪; ইমাম আজলুনী: কাশফুল খফা, হাদিস নং ১২৯৪;)


এই হাদিস মোতাবেক সকল আমলের মগজ হল দোয়া, তাই প্রত্যেক আমল শেষ করার পর আমাদের দোয়া করা উচিৎ। এছাড়াও দোয়া করার আরো কারণ রয়েছে। যেমন, 


এ সম্পর্কে অপর হাদিসে আছে, ইমাম তিরমিজি, ইমাম তাবারানী (رحمة الله عليه) বর্ণনা করেছেন,

حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ، أَخْبَرَنَا سُفْيَانُ، عَنِ الْأَعْمَشِ، وَمَنْصُورٍ، عَنْ ذَرٍّ، عَنْ يُسَيْعٍ الْكِنْدِيِّ عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ،

-“হযরত নুমান ইবনে বাশির (رضي الله عنه) নবী করিম (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন, প্রিয় নবীজি (ﷺ) বলেছেন: দোয়া একটি ইবাদত।” 

(মুসনাদু আবী দাউদ ত্বায়ালিছী, হাদিস নং ৮৩৮; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ১৮৩৫২ ও ১৮৩৮৬; ইমাম বুখারী: আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ৭১৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৮২৮; সুনানে আবী দাউদ, হাদিস নং ১৪৭৯; তিরমিজি শরীফ, হাদিস নং ২৯৬৯; মুসনাদে বাজ্জার, হাদিস নং ৩২৪৩; ইমাম নাসাঈ: সুনানে কুবরা, হাদিস নং ১১৪০০; সহীহ্ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৮৯০; ইমাম তাবারানী: আদ-দোয়া, হাদিস নং ২; ইমাম তাবারানী: মু’জামুছ ছাগীর, হাদিস নং ১০৪১; ইমাম তাবারানী: মু’জামুল কবীর, হাদিস নং ১৯১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস নং ১৮০২;)


এই হাদিস সম্পর্কে ইমাম তিরমিজি (رحمة الله عليه) বলেন, هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ. 

-“এই হাদিস হাছান সহীহ্।” 


ইমাম হাকেম নিছাপুরী (رحمة الله عليه) বলেন, هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ -“এই হাদিসের সনদ সহীহ্।” নাছিরুদ্দিন আলবানী তার ‘সহীহ্ আদাবুল মুফরাদ’ কিতাবের ৫৫৩ নং হাদিসের তাহকিকে صَحِيحٌ সহীহ্ বলেছেন।


এখানে مُطْلَقًا মত্বলকান তথা শর্তহীন সকল দোয়াকে ইবাদত বলা হয়েছে। অতএব, স্পষ্ট হাদিস দ্বারা নিষিদ্ধতা প্রমাণ ব্যতীত সকল দোয়াই এবাদতের অন্তর্ভূক্ত হবে। এ ক্ষেত্রে ফরজ নামাজের পরে দোয়াও এবাদতের অন্তর্ভূক্ত হবে। আর কোন এবাদতের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার কারো নেই। দোয়া করার বিষয়ে মহান আল্লাহ তা’লা বলেন: وَقالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ 

-“আর তোমাদের রব বললেন: তোমরা আমার কাছে দোয়া কর আমি সাড়া দিব।” (সূরা গাফির: ৬০ নং আয়াত) 

এখানে শর্তহীনভাবে বলা হয়েছে দোয়া কর। সুতরাং নিষিদ্ধ সময় ব্যতীত বাকী সকল সময়ই আল্লাহর কাছে দোয়া করার অনুমতি রয়েছে। যদি ধরেও নেই সালাত’ই দোয়া, তারপরও বলব সালাতের পরে দোয়া করার নিষেধাজ্ঞা নেই। স্বয়ং আল্লাহর নবী (ﷺ) ফরজ নামাজের পরে দোয়া করেছেন, সাহাবীরা করেছেন। তাহলে তাঁরা কি জানতেন না যে, সালাতের পরে দোয়ার দরকার নেই? (নাউজুবিল্লাহ) পবিত্র কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন ফরজ নামাজের পর দোয়া করার জন্য। তাহলে আল্লাহ তা’লাও কি ভুল বলেছেন? (নাউজুবিল্লাহ) ‘আহলে কিতাবরা’ ফরজ ও সুন্নাত নামাজের মাঝে দোয়া না করার কারণে তারা ধ্বংস হয়ে গেছে। 


আর আমাদের নবী রাসূলে পাক (ﷺ) বলেছেন, ইমাম বুখারী, ইমাম তিরমিজি, ইমাম ইবনে মাজাহ, ইমাম আহমদ, ইমাম বাজ্জার (رحمة الله عليه) প্রমূখ বর্ণনা করেছেন,

 حَدَّثَنَا قُتَيْبَةُ، قَالَ: حَدَّثَنَا حَاتِمُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ، عَنْ أَبِي الْمَلِيحِ، عَنْ أَبِي صَالِحٍ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ لَا يَدْعُو اللَّهَ يَغْضَبْ عَلَيْهِ،

-“হযরত আবু হুরায়রা (رضي الله عنه) বলেন, আল্লাহর হাবীব (ﷺ) বলেছেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দোয়া করেনা তার উপর আল্লাহ রাগ করেন।” 

(ইমাম বুখারী: আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ৬৫৮; তিরমিজি শরীফ, হাদিস নং ৩৩৭৩; মেসকাত শরীফ, ১৯৫ পৃঃ; সুনানে ইবনে মাজাহ শরীফ, ২৭১ পৃঃ; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ৯৭০১; মুসনাদে বাজ্জার, হাদিস নং ৯৪২৫; ইমাম তাবারানী: আদ-দোয়া, হাদিস নং ২৩; ইমাম তাবারানী: মু’জামুল আওছাত, হাদিস নং ২৪৩১; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস নং ১৮০৬; ইমাম বায়হাক্বী: দাওয়াতুল কবীর, হাদিস নং ২২; ইমাম বায়হাক্বী: শুয়াবুল ঈমান, হাদিস নং ১০৬৫; মুসনাদে আবী ইয়ালা, হাদিস নং ৬৬৫৫; ইমাম মোল্লা আলী: মেরকাত শরহে মেসকাত, ৫ম খন্ড, ১২৩ পৃঃ;)


এই হাদিস সম্পর্কে ইমাম হাকেম (رحمة الله عليه) বলেন, هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحُ الْإِسْنَادِ 

-“এই হাদিসের সনদ সহীহ্।” 


নাছিরুদ্দিন আলবানী তার ছিলছিলায়ে দ্বায়িফা কিতাবের ২১ নং হাদিসের তাহকিকে হাদিসটিকে حسن হাছান বলেছেন। তাই আল্লাহর গোস্বার কূপানল থেকে বাঁচতে হলে বেশী বেশী দোয়া করা উচিৎ। এতেই আল্লাহর রহমত তথা করুণা লাভ করা সম্ভব। 


কেননা আল্লাহর নবী (ﷺ) আরো বলেছেন, ইমাম তাবারানী, ইমাম হাকেম, ইমাম বায়হাক্বী (رحمة الله عليه) বর্ণনা করেছেন,

حَدَّثَنَاهُ أَبُو بَكْرِ بْنُ إِسْحَاقَ، أَنْبَأَ أَبُو الْمُثَنَّى، ثنا مُسَدَّدٌ، ثنا عَبْدُ الْوَاحِدِ بْنُ زِيَادٍ، ثنا هِلَالُ بْنُ خَبَّابٍ، عَنْ عِكْرِمَةَ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِعَمِّهِ الْعَبَّاسِ: يَا عَمِّ أَكْثِرِ الدُّعَاءَ

-“হযরত ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) বর্ণনা করেন, নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) তাঁর চাচাকে বললেন: ওহে চাচা! আপনি অধিক পরিমাণে দোয়া করুন।”

(ইমাম তাবারানী: মু’জামুল কবীর, হাদিস নং ১১৯০৮; মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস নং ১৯৩৯; ইমাম বায়হাক্বী: দাওয়াতুল কবীর, হাদিস নং ২৮১; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব, ১ম খন্ড; মেসকাত শরীফ, ১৯৬ পৃঃ; ইমাম মোল্লা আলী: মেরকাত শরহে মেসকাত, ৫ম খন্ড, ১২৫ পৃঃ; তিরমিজি শরীফ;) 


এই হাদিস সম্পর্কে ইমাম হাকেম নিছাপুরী (رحمة الله عليه) বলেন,

هَذَا حَدِيثٌ صَحِيحٌ عَلَى شَرْطِ الْبُخَارِيِّ 

“ইমাম বুখারীর শর্তে এই হাদিস সহীহ্।” 


নাছিরুদ্দিন আলবানী তার ছিলছিলায়ে দ্বায়িফা কিতাবের ১৫২৩ নং হাদিসের ব্যাখ্যায় হাদিসটিকে حسن হাছান বলেছেন। অতএব, বেশী বেশী দোয়া করার পিছনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের রেজামন্দী নিহিত। তাই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অধিকহারে দোয়া করা উচিৎ। যারা দোয়া থেকে মুসলমানদেরকে বাধা দিবে তারা নি:সন্দেহে ইহুদী-নাছারাদের দালাল ও ইসলামের দুশমন।

Top