❏ নামাজের পর দোয়ায় হাত তোলা
ফরজ নামাজের পর দোয়া করার বিষয়টি মশহুর পর্যায়ের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, কারো কারো মতে ‘তাওয়াতুর’ পর্যায়ের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হল। যেমন:
শারিহে বুখারী ওয়া তিরমিজি আল্লামা আনওয়ার শাহ্ কাশ্মিরী (رحمة الله عليه) ছাহেব বলেছেন,
نعم الأدعية بعد الفريضة ثابتة كثيراً بلا رفع اليدين وبدون الاجتماع وثبوتها متواتر
-“হাত উঠানো ও ইজতেমাঈ ব্যতীত ফরজ নামাজের পরে দোয়ার বিষয়ে ‘তাওয়াতুর’ পর্যায়ের হাদিস রয়েছে।”
(কাশ্মিরী: আরফুস সাজী শরহে তিরমিজি, ১ম খন্ড, ৩৪৬ পৃঃ;)
অতএব, ফরজ নামাজের পর মত্বলকান বা শর্তহীন দোয়া অস্বীকার মূলত মুতাওয়াতির পর্যায়ের হাদিস অস্বীকার করা নামান্তর। আর উছুল অনুযায়ী ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের হাদিস অস্বীকার কারীর উপর কুফূরীর ফাতওয়া বর্তায়। এখন বাকী রইল সেই দোয়ার সময় হাত তোলে দোয়া করব নাকি শুধু মুখে দোয়া পাঠ করব। এ সম্পর্কে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এর অবস্থান হল ফরজ নামাজের পর দুই হাঁত তোলে দোয়া করা মুস্তাহাব পর্যায়ের সুন্নাত। কেননা পবিত্র হাদিস শরীফ থেকে জানা যায়, রাসূলে পাক (ﷺ) ও সাহাবায়ে কেরাম ফরজ নামাজের পর দুই হাঁত তোলে দোয়া করেছেন। যেমন এ বিষয়ে নিচের দলিল গুলো লক্ষ্য করুন,
ইমাম তাবারানী (র:) বর্ণনা করেছেন,
حَدَّثَنَا سُلَيْمَانُ بْنُ الْحَسَنِ الْعَطَّارُ، قَالَ: حَدَّثَنَا أَبُو كَامِلٍ الْجَحْدَرِيُّ، قَالَ: حَدَّثَنَا الْفُضَيْلُ بْنُ سُلَيْمَانَ، قَالَ: حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ أَبِي يَحْيَى، قَالَ: رَأَيْتُ عَبْدَ اللهِ بْنَ الزُّبَيْرِ وَرَأَى رَجُلًا رَافِعًا يَدَيْهِ بِدَعَوَاتٍ قَبْلَ أَنْ يَفْرُغَ مِنْ صَلَاتِهِ، فَلَمَّا فَرَغَ مِنْهَا، قَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَكُنْ يَرْفَعْ يَدَيْهِ حَتَّى يَفْرُغَ مِنْ صَلَاتِهِ
-“মুহাম্মদ ইবনে আবী ইয়াহইয়া বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (رضي الله عنه) কে দেখেছি যে, তিনি এক ব্যক্তির নামাজ থেকে বের হওয়ার পূর্বে হাত উঠিয়ে দোয়া করতে দেখেন। যখন ঐ লোক নামাজ থেকে বের হলেন তখন বললেন: নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নামাজ থেকে বের হয়ে হাঁত তোলে দোয়া করতেন।”
(ইমাম তাবারানী: মু’জামুল কবীর, হাদিস নং ৩২৪ ও ১৪৯০৭; হাফিজ ইবনে কাছির: জামেউল মাসানিদ ওয়াস সুনান, হাদিস নং ৬৩৯৪; মুবারকপুরী; তুহফাতুল আহওয়াজী, ২য় খন্ড, ১০০ পৃঃ; ইমাম হায়ছামী; মাজমুয়ায়ে জাওয়াইদ, হাদিস নং ১৭৩৪৫;)
এই হাদিস সম্পর্কে ইমাম হায়ছামী (رحمة الله عليه) বলেন, وَرِجَالُهُ ثِقَاتٌ -“এর সকল বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত।”(ইমাম হায়ছামী: মাজমুয়ায়ে জাওয়াইদ, হাদিস নং ১৭৩৪৫;)
এই হাদিসের দুইজন রাবী বা বর্ণনাকারী নিয়ে লা-মাজহাবীদের কেউ কেউ সমালোচনা করার অপচেস্টা করেন। যেমন:-
এক. سليمان بن الحسن العطار (সুলাইমান ইবনে হাছান আত্বার)
এই রাবী থেকে ‘সহীহ ইবনে হিব্বানে’ একাধিক রেওয়ায়েত বর্ণিত আছে।
ইমাম তাবারানী (رحمة الله عليه) তাঁর ‘আদ্ দোয়া, মু’জামুল আওছাত, মু’জামুল কবীর, মুসনাদে শামেঈন’ গ্রন্থে একাধিক রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু নুয়াইম ইস্পাহানী (رحمة الله عليه) তাঁর ‘হিলিয়াতুল আউলিয়া’ গ্রন্থে এই রাবী থেকে রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন। ইমাম বায়হাক্বী (رحمة الله عليه) তদীয় ‘শুয়াবুল ঈমান’ গ্রন্থে এই রাবী থেকে রেওয়ায়েত বর্ণনা করেছেন।
আল্লামা হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (رحمة الله عليه) তাঁর ‘ইত্তেহাফু মিহরাত’ গ্রন্থে এই রাবীর অনেক গুলো রেওয়ায়েত উল্লেখ করে কোন সমালোচনা করেননি।
এমনকি স্বয়ং নাছিরুদ্দিন আলবানী তার ‘তালিকাত হাছান আলা ছাহি ইবনে হিব্বান’ গ্রন্থে একাধিক স্থানে ‘সুলাইমান ইবনে হাছান আত্ত¡ার’ এর রেওয়ায়েতকে صَحِيحٌ সহীহ্ বলেছেন। যেমন দেখুন ঐ কিতাবের হাদিস নং ৪৪১৯, ৪১৮২, ৩৭১৮, ৫৮০১, ৬০৩৩,...।
দুই. الفضيل بن سليمان (ফুদ্বাইল ইবনে সুলাইমান)
এই রাবী সম্পর্কে কুখ্যাত তাহকিককারী নাছিরুদ্দিন আলবানী বলেছেন তার রেওয়ায়েত দ্বায়িফ। অথচ সহীহ্ বুখারী ও মুসলীমে তার বর্ণিত ৮টি রেওয়ায়েত রয়েছে। যেমন সহীহ্ বুখারীর হাদিস নং ২৫২৫, ৩১৫২, ৪৩০৭, ৪৪৬৮, ৪৯৩৬, ৬৪১৪ ও ৭৩৫৭ এবং সহীহ্ মুসলীম শরীফের হাদিস নং ২০৬৫।
বুখারী শরীফে মোট ৭টি রেওয়ায়েত রয়েছে এবং মুসলীম শরীফে তার থেকে ১টি রেওয়ায়েত রয়েছে। বলুন বুখারী ও মুসলীমের এই ৮টি হাদিস কি দ্বায়িফ?!
ووثقه مسلم. -“ইমাম মুসলীম (رحمة الله عليه) তাকে বিশ্বস্ত বলেছেন।”(ইমাম যাহাবী: দিওয়ানুদ দোয়াফা, রাবী নং ৩৩৮৯;)
وذكره ابنُ حِبَّان في كتاب (الثقات) -
“ইমাম ইবনে হিব্বান (رحمة الله عليه) তাকে বিশ্বস্তদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন।”(ইমাম ইবনে হিব্বান: কিতাবুস সিক্বাত, রাবী নং ১০২৪৮; ইমাম আসকালানী: তাহজিবুত তাহজিব, রাবী নং ৫৩৬; ইমাম মিযযী: তাহজিবুল কামাল, রাবী নং ৪৭৫৯;)
ইমাম তিরমিজি (رحمة الله عليه) তার বর্ণিত রেওয়ায়েতকে حَسَنٌ صَحِيحٌ (হাছান-সহীহ) বলেছেন। দেখুন তিরমিজি শরীফ হাদিস নং ৩৮৫৬ ও ৩৯২৬।
ইমাম হাকেম নিছাপুরী (رحمة الله عليه) তার রেওয়ায়েতকে صَحِيحٌ সহীহ্ বলেছেন, দেখুন ‘মুস্তাদরাকে হাকেম’ হাদিস নং ৮৬। লা-মাজহাবী আব্দুর রহমান মুবারকপুরী তার ‘তুহফাতুল আহওয়াজী’ কিতাবের ৩৮৫৬ নং হাদিসে ‘ফুদাইল ইবনে সুলাইমান’ এর রেওয়ায়েতকে صَحِيحٌ সহীহ্ বলে সমর্থন করেছেন।
ইমাম যাহাবী (رحمة الله عليه) বলেন: قلت: قد احتجّ به الجماعة. -“আমি বলি: একদল ইমাম তার উপর নির্ভর করেছেন।”(ইমাম যাহাবী: তারিখুল ইসলামী, রাবী নং ২৮৯;)
অতএব, উক্ত দুইজন রাবীর বর্ণিত রেওয়ায়েত সহীহ্ হওয়ার ব্যাপারে কোন প্রতিবন্ধকতা রইল না। তাই নামাজের পরে দুই হাত উঠিয়ে মুনাজাত করার বিষয়ে রেওয়ায়েতটি বুখারী-মুসলীমের শর্ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ صَحِيحٌ সহীহ্। অতএব, এই হাদিস দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, স্বয়ং দ্বীনের নবী রাসূলে পাক (ﷺ) নামাজ থেকে বের হওয়ার পরে হাঁত তোলে দোয়া করেছেন। তাই নামাজের পর হাত তোলে দোয়া স্বয়ং রাসূল (ﷺ)’র সুন্নাত।
এ বিষয়ে আরেক হাদিসে আছে, ইমাম ইবনু খুজাইমা, ইমাম তিরমিজি, ইমাম নাসাঈ, ইমাম তাবারানী, ইমাম আহমদ (رحمة الله عليه) প্রমূখ বর্ণনা করেছেন,
حَدَّثَنَا سُوَيْدُ بْنُ نَصْرٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ بْنُ الْمُبَارَكِ، قَالَ: أَخْبَرَنَا اللَّيْثُ بْنُ سَعْدٍ، قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ رَبِّهِ بْنُ سَعِيدٍ، عَنْ عِمْرَانَ بْنِ أَبِي أَنَسٍ، عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ نَافِعِ ابْنِ الْعَمْيَاءِ، عَنْ رَبِيعَةَ بْنِ الحَارِثِ، عَنِ الفَضْلِ بْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الصَّلاَةُ مَثْنَى مَثْنَى، تَشَهَّدُ فِي كُلِّ رَكْعَتَيْنِ، وَتَخَشَّعُ، وَتَضَرَّعُ، وَتَمَسْكَنُ، وَتُقْنِعُ يَدَيْكَ، يَقُولُ: تَرْفَعُهُمَا إِلَى رَبِّكَ، مُسْتَقْبِلاً بِبُطُونِهِمَا وَجْهَكَ، وَتَقُولُ: يَا رَبِّ يَا رَبِّ، وَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَهِيَ خِدَاجٌ.
-“হযরত ফজল ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলে পাক (ﷺ) বলেছেন: নামাজ হল দু’রাকাত দু’রাকাত করে, প্রতি দু’রাকাত পরে আছে তাশাহুদ, নামাজে আছে খুশু-খুজু, ধীর-স্থীর ভাবে তা আদায় করবে অত:পর দুই হাঁত উচু করবে। দুই হাঁত উপরে উঠিয়ে ভিতরের দিক চেহারার সামনের দিকে রেখে বলবে: হে আল্লাহ! হে আল্লাহ! আর যে ব্যক্তি এ কাজ গুলো করবে না তার নামাজ হবে লেজ কাটা।”
(সহীহ্ ইবনে খুজাইমা, ১ম খন্ড, ৫১৯ পৃঃ; সহীহ্ তিরমিজি শরীফ, ১ম জি: ৮৭ পৃঃ; মেসকাত শরীফ, ৭৭ পৃঃ হাদিস নং ৮০৫; ইমাম নাসাঈ: সুনানে কুবরা, হাদিস নং ৬১৮; ইমাম তাবারানী: আদ-দোয়া, হাদিস নং ২১০; ইমাম তাবারানী: মু’জামুল আওছাত, হাদিস নং ৮৬৩২; ইমাম মোল্লা আলী: মেরকাত শরহে মেসকাত, ২য় খন্ড, ৪৮৩ পৃঃ; মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ১৭৯৯; মুসনাদে আবী ইয়ালা, ১১৭৩ পৃঃ হাদিস নং ৬৭৩৮; ইমাম হিন্দী: কানজুল উম্মাল, ৭ম খন্ড, ২১৩ পৃঃ; সনদ সহীহ্।)
এই হাদিস সম্পর্কে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (رحمة الله عليه) বলেন,
قَالَ ابْنُ حَجَرٍ: وَسَنَدَهُ حَسَنٌ. -
“হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (رحمة الله عليه) বলেন: এর সনদ হাছান।”(ইমাম মোল্লা আলী: মেরকাত শরহে মেসকাত, ৮০৫ নং হাদিসের ব্যাখ্যায়;)
উল্লেখিত রেওয়ায়েতটি হযরত লাইছ (رحمة الله عليه) এর সূত্রে বর্ণিত, ইমাম তিরমিজি (رحمة الله عليه) এর সনদ সম্পর্কে বলেন, وَحَدِيثُ اللَّيْثِ أَصَحُّ مِنْ حَدِيثِ شُعْبَةَ، -
“শুবা (رحمة الله عليه) এর রেওয়ায়েতের চেয়ে লাইছ (رحمة الله عليه) এর রেওয়ার অধিক সহীহ্।” (তিরমিজি শরীফ)
এ বিষয়ে আরেকটি রেওয়ায়েত উল্লেখ করা যায়। ইমাম আহমদ, ইমাম নাসাঈ, ইমাম তাহাবী, ইমাম বায়হাক্বী, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম দারা কুতনী (رحمة الله عليه) প্রমূখ বর্ণনা করেছেন,
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ جَعْفَرٍ، حَدَّثَنَا شُعْبَةُ، قَالَ: سَمِعْتُ عَبْدَ رَبِّهِ بْنَ سَعِيدٍ، يُحَدِّثُ عَنْ أَنَسِ بْنِ أَبِي أَنَسٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ نَافِعِ ابْنِ الْعَمْيَءِ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْحَارِثِ، عَنْ الْمُطَّلِبِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: الصَّلَاةُ مَثْنَى مَثْنَى، وَتَشَهَّدُ فِي كُلِّ رَكْعَتَيْنِ، وَتَبَأَّسُ، وَتَمَسْكَنُ، وَتُقْنِعُ يَدَكَ وَتَقُولُ: اللَّهُمَّ اللَّهُمَّ، فَمَنْ لَمْ يَفْعَلْ ذَلِكَ، فَهِيَ خِدَاجٌ
-“হযরত মুত্তালিব (رضي الله عنه) নবী করিম (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বলেছেন: নামাজ হল দুই দুই রাকাত করে, প্রতি দুই রাকাত পরে আছে তাশাহুদ, এতে রয়েছে ধীর স্থিরতা ন¤্রতা, অত:পর দুই হাত উচু করবে এবং বলবে: আল্লাহুম্মা আল্লাহুম্মা.. । যারা এরূপ এরূপ করবেনা তাদের নামাজ হবে লেজকাটা।”
(মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ১৭৫২৩; মুসনাদে আবী দাউদ ত্বয়ালিছী, হাদিস নং ১৪৬৩; সুনানে আবী দাউদ, হাদিস নং ১২৯৬; ইমাম নাসাঈ: সুনানে কুবরা, হাদিস নং ৬১৯; ইমাম তাহাবী: শরহে মুশকিলুল আছার, হাদিস নং ১০৯২; সুনানে দারে কুতনী, হাদিস নং ১৫৪৮; ইমাম বায়হাক্বী: সুনানে কুবরা, হাদিস নং ৪২৫২;)
উক্ত হাদিসদ্বয়ে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, প্রিয় নবীজি (ﷺ) নামাজের পর দোয়া করার সময় দুই হাঁত উচু করার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন:
تَرْفَعُهُمَا إِلَى رَبِّكَ، مُسْتَقْبِلاً بِبُطُونِهِمَا وَجْهَكَ -
“দুই হাঁত উপরে উঠিয়ে ভিতরের দিক চেহারার সামনে রাখবে।”
আরেক রেওয়ায়েতে আছে وَتُقْنِعُ يَدَكَ -“দুই হাত উচু করবে।”
আর এই দোয়া সকল নামাজের পরেই প্রমাণিত হবে। কারণ এখানে الصَّلاَةُ (আছ-ছালাত) শব্দটি مُطْلَقًا মত্বলকান বা শর্তহীন ভাবে উল্লেখ রয়েছে। তাই এই হাদিস দ্বারা প্রত্যেক নামাজের পরে হাত উঠিয়ে দোয়া প্রমাণিত হবে। সুতরাং রাসূলে পাক (ﷺ)’র সহীহ্ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হল, নামাজের পর দুই হাঁত উঠিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা জায়েয বরং আল্লাহর নবী (ﷺ)’র শিক্ষা। অতএব, স্পষ্ট প্রমাণিত হয়ে গেল নামাজের পর দুই হাঁত উঠিয়ে দোয়া করা স্বয়ং আল্লাহর হাবীব (ﷺ)’র শিক্ষা। অথচ ওহাবীরা বলে নামাজের পর হাত উঠিয়ে দোয়া করা বিদয়াত! (নাউজুবিল্লাহ) আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত করুক। আমিন!
এ সম্পর্কে আরেক হাদিসে আছে, ইমাম ইবনু আবী হাতেম (رحمة الله عليه) বর্ণনা করেছেন,
حَدَّثَنَا أَبِي، ثنا أَبُو مَعْمَرٍ الْمِنْقَرِيُّ، ثنا عَبْدُ الْوَارِثِ، ثنا عَلِيُّ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيِّبِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى الله عليه وسلم رَفَعَ يَدَيْهِ بَعْدَ مَا سَلَّمَ وَهُوَ مُسْتَقْبِلَ الْقِبْلَةِ فَقَالَ اللَّهُمَّ خَلِّصِ الْوَلِيدَ بْنَ الْوَلِيدِ وَعَيَّاشَ بْنَ أَبِي رَبِيعَةَ وَسَلَمَةَ بْنَ هِشَامٍ وَضَعَفَةَ الْمُسْلِمِينَ الَّذِينَ لَا يَسْتَطِيعُونَ حِيلَةً وَلَا يهتدون سبيلا من أيدي الكفار
-“হযরত আবু হুরায়রা (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) সালামের পর দুই হাঁত উচু করতেন, আর তখন তিনি কেবলামুখী ছিলেন। অত:পর (দোয়ায়) বলতেন: “আল্লাহুম্মা খাল্লিছ ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ ওয়া আইয়াস ইবনে আবী রবিয়া ওয়া সালামাতা ইবনে হিশাদ ওয়া দ্বায়াফাতাল মুসলিমিনা আল্লাজিনা লা ইয়াসতাতিউনা হিয়ালাতান ওয়ালা ইয়াহতাদুনা ছাবিলা মিন আইদিল কুফ্ফার।”
(তাফছিরে ইবনে আবী হাতেম, হাদিস নং ৫৮৭২; মুসনাদে বাজ্জার; তুহফাতুল আহওয়াজী, ২য় খন্ড, ১৭০ পৃঃ; তাফছিরে ইবনে কাছির, সূরা নিসা: ৯৭-১০০ আয়াতের তাফছির;)
এই হাদিসের রাবী ‘আলী ইবনে ইয়াজিদ’ এর পুরো নাম হলো,
علي بن زيد بن عبد الله بن أبي مليكة
‘আলী ইবনে ইয়াজিদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আবী মুলাইকা’ আর সে হাছান স্তরের রাবী। কারণ ইমামদের অনেকে তাকে দুর্বল বলেছেন এবং অনেকেই তাকে সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত বলেছেন। যেমন:
ইমাম মুগলতাঈ (رحمة الله عليه) উল্লেখ করেছেন:-
وذكره ابن خلفون في كتاب الثقات وقال: عابدا ورعا صدوقا وذكره مسلم بن الحجاج في الطبقة الثالثة من أهل البصرة، وقال ابن القطان: تركه قوم وضعفه آخرون، ووثقه جماعة،
-“ইমাম ইবনে খালিফুন (رحمة الله عليه) তাকে বিশ্বস্তদের অন্তর্ভূক্ত করেছেন। আর বলেছেন: সে একজন সত্যবাদী আবিদ এবং ওলী ছিলেন। ইমাম মুসলীম ইবনে হাজ্জায (رحمة الله عليه) তাকে বছরা বাসীদের মধ্যে তৃতীয় তবকার রাবী বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে কাত্তান (رحمة الله عليه) বলছেন: কেউ কেউ তাকে তরক করেছেন এবং কেউ কেউ তাকে দ্বায়িফ বলেছেন আবার একদল ইমাম তাকে বিশ্বস্ত বলেছেন।”
(ইমাম মুগলতাঈ: ইকমালু তাহজিবুল কামাল, রাবী নং ৩৭৮৬;)
ইমাম বদরুদ্দিন আইনী (رحمة الله عليه) উল্লেখ করেছেন,
وقال العجلى: لا بأس به. وقال الترمذى: صدوق، -
“ইমাম তিরমিজি (رحمة الله عليه) বলেছেন: সে সত্যবাদী। ইমাম আজলী (رحمة الله عليه) বলেছেন: তার ব্যাপারে অসুবিধা নেই।”(ইমাম আইনী: মাগানিল আখইয়ার, রাবী নং ১৮৫৩;)
ইমাম বুখারী (رحمة الله عليه) উল্লেখ করেছেন,
قَالَ أَحْمَد بْن سَعِيد، عَنْ عَبد الصَّمد، عَنْ شُعبة؛ كَانَ عَلِيّ رَفّاعًا. -
“আহমদ ইবনে সাঈদ (رحمة الله عليه) ইমাম আব্দুস সামাদ হতে, তিনি হযরত শুবা (رحمة الله عليه) বলেন: আলী উচু মাপের লোক ছিল।”(ইমাম বুখারী: তারিখুল কবীর, রাবী নং ২৩৮৯;)
‘
আলী ইবনে ইয়াজিদ’ এর রেওয়ায়েতকে ইমাম হাকেম (رحمة الله عليه) বুখারী মুসলীমের শর্তে সহীহ্ বলেছেন এবং ইমাম যাহাবী (رحمة الله عليه) একমত পোষন করেছেন। (আল মুস্তাদরাক, হাদিস নং ৩৯১৫)
ইমাম তিরমিজি (رحمة الله عليه) তার বর্ণিত হাদিসকে হাছান-সহীহ্ বলেছেন। (তিরমিজি শরীফ, হাদিস নং ১০৯, ৫৪৫, ১১৪৬)
নাছিরুদ্দিন আলবানী তার রেওয়ায়েতকে সহীহ্ বলেছেন। (তিরমিজি শরীফ এর তাহকিক, হাদিস নং ৭৬৪, ১১৪৬, ১৭৩২)
সহীহ্ মুসলীম গ্রন্থে ‘আলী ইবনে ইয়াজিদ’ থেকে হাদিস বর্ণিত আছে। (সহীহ্ মুসলীম, হাদিস নং ১৭৮৯)
অতএব, এই হাদিসের সর্বনি¤œ স্তর হবে সহীহ্ অথবা হাছান।
এই হাদিসটি অন্য শব্দে এভাবে রয়েছে, ইমাম আহমদ, ইমাম তাবারী (رحمة الله عليه) বর্ণনা করেছেন,
حَدَّثَنِي الْمُثَنَّى قَالَ: ثنا حَجَّاجٌ قَالَ: ثنا حَمَّادٌ عَنْ عَلِيِّ بْنِ زَيْدٍ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ أَوْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الْقُرَشِيِّ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَدْعُو فِي دُبُرِ صَلَاةِ الظُّهْرِ اللَّهُمَّ خَلِّصِ الْوَلِيدَ وَسَلَمَةَ بْنَ هِشَامٍ وَعَيَّاشَ بْنَ أَبِي رَبِيعَةَ وَضَعَفَةَ الْمُسْلِمِينَ مِنْ أَيْدِي الْمُشْرِكِينَ الَّذِينَ لَا يَسْتَطِيعُونَ حِيلَةً وَلَا يَهْتَدُونَ سَبِيلًا
-“হযরত আবু হুরায়রা (رضي الله عنه) বর্ণনা করেন, নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল (ﷺ) প্রত্যেক জোহর নামাজের পর এই দোয়া করতেন: “আল্লাহুম্মা খাল্লিছ ওয়ালিদ ইবনে ওয়ালিদ ওয়া আইয়াস ইবনে আবী রবিয়া ওয়া সালামাতা ইবনে হিশাদ ওয়া দ্বায়াফাতাল মুসলিমিনা মিন আইদিল মুশরিকিনা আল্লাজিনা লা ইয়াসতাতিউনা হিয়ালাতান ওয়ালা ইয়াহতাদুনা ছাবিলা।”
(মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং ৯২৮৫; তাফছিরে তাবারী, ৭ম খন্ড, ৩৮৯ পৃঃ; তাফছিরে দুর্রে মানছুর, ২য় খন্ড, ৬৪৮ পৃঃ; মুবারকপুরী: তুহফাতুল আহওয়াজী, ২য় খন্ড, ১৭০ পৃঃ; তাফছিরে ইবনে কাছির, সূরা নিসা: ৯৭-১০০ আয়াতের তাফছির;)
সুতরাং উপরে উল্লেখিত দু’টি রেওয়ায়েত দ্বারা প্রমাণিত হয়, আল্লাহর রাসূল (ﷺ) ফরজ নামাজের পর হাঁত উঠিয়ে দোয়া করতেন। তাই ফরজ নামাজের পর হাত তোলে দোয়া করা সুন্নাতে রাসূল। সর্বোপরি দোয়া সময় হাঁত উত্তোলন করা রাসূল (ﷺ)’র আরেকটি গুণ ছিল। কারণ তিনি যখন’ই দোয়া করতেন তখনই হাঁত উত্তোলন করে করতেন বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে আরেকটি রেওয়ায়েত রয়েছে, ইমাম ইবনু সুন্নী (رحمة الله عليه) বর্ণনা করেছেন,
حَدَّثَنِي أَحْمَدُ بْنُ الْحَسَنِ بْنِ أَدِيبَوَيْهِ، ثنا أَبُو يَعْقُوبَ إِسْحَاقُ بْنُ خَالِدِ بْنِ يَزِيدَ الْبَالِسِيُّ، ثنا عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ الْبَالِسِيُّ، عَنْ خُصَيْفٍ، عَنْ أَنَسٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ مَا مِنْ عَبْدٍ بَسَطَ كَفَّيْهِ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ ثُمَّ يَقُولُ اللَّهُمَّ إِلَهِي وَإِلَهَ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَإِلَهَ جِبْرِيلَ وَمِيكَائِيلَ وَإِسْرَافِيلَ أَسْأَلُكَ أَنْ تَسْتَجِيبَ دَعْوَتِي فَإِنِّي مُضْطَرٌّ وَتَعْصِمَنِي فِي دِينِي فَإِنِّي مُبْتَلًى وَتَنَالَنِي بِرَحْمَتِكَ فَإِنِّي مُذْنِبٌ وَتَنْفِيَ عَنِّيَ الْفَقْرَ فَإِنِّي مُتَمَسْكِنٌ إِلَّا كَانَ حَقًّا عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ أَنْ لَا يَرُدَّ يَدَيْهِ خَائِبَتَيْنِ
-“হযরত আনাস (رضي الله عنه) নবী করিম (ﷺ) থেকে বর্ণনা করেন, প্রিয় নবীজি (ﷺ) বলেছেন: যখন কোন বান্দা প্রত্যেক ফরজ নামাজের পরে দুই হাত প্রসারিত করে বলবে: “হে আল্লাহ! আপনি আমার ও ইব্রাহিম, ইসহাক্ব ও ইয়াকুবের ইলাহী। জিব্রাইল, মিকাইল ও ইস্রাফিরেরও এলাহী। আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি আপনি আমার সাড়া দিন।..... তখন আল্লাহ পাকের জন্য আবশ্যক হয়ে যায় তার দুই হাত খালি না ফিরাতে।”
(ইমাম ইবনে সুন্নী: আমালু ইয়ামি ওয়া লাইলাতি, হাদিস নং ১৩৮; তুহফাতুল আহওয়াজী, ২য় খন্ড, ১৭১ পৃঃ;)
এই হাদিসে স্পষ্ট বলা আছে প্রত্যেক নামাজের পর হাত প্রসারিত করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার জন্য, এতেই মহান আল্লাহ পাক নিশ্চিত ঐ দোয়া কবুল করবেন। হযরত আবু উমামা বাহেলী (رضي الله عنه)’র রেওয়ায়েত এবং এই রেওয়ায়েত একত্রে করলে বুঝা যায়, ফরজ নামাজের পরে হাত তোলে দোয়া করলে ঐ দোয়া কবুল হওয়ার নিশ্চত গ্যারান্টি রয়েছে।